Header Ads

বৃষ্টি-কাতর




বৃষ্টি নিয়ে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর স্মৃতি আমার এক পুরনো প্রেমিকার সাথে। ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল তখন, আর একটাই ছাতা। বোকার মতন সেদিন লোকালয় এবং বাসস্ট্যান্ড থেকে দূরে একটা জায়গাতে ভুলে নেমেছিলাম আমরা। জড়সড় করে এক ছাতার নিচে, বৃষ্টি থেকে দূরে থাকার কী চেষ্টাই না ছিল আমার। সম্ভবত যতটুকু মনে পড়ে ওটাই প্রথম আর ওটাই শেষবার ছিল আমি বৃষ্টি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলাম । আসলে বৃষ্টি থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলাম বললে ভুল হবে- প্রেমিকার আরো কাছে যেতে চেয়েছিলাম।
তাছাড়া আজো কখনও বৃষ্টির ডাকে সাড়া না দেওয়ার জন্য মন সাঁয় দেয়নি। 
দুইভাবে বৃষ্টিকে উপভোগ করার সুযোগ হয় আমার।
এক। ছোটবেলায় খুবই  প্রত্যক্ষভাবে উপভোগ করেছি। মুখ কাল করে থাকা মেঘ অথবা রাগে গরগর করতে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির আলামত পেতাম । কখনও কখনও  ঝড়ের সাথেও আসতো। গ্রীষ্মকাল থেকে শুরু করে ঝমঝমে বর্ষার বেশ কিছু সময়ই কাকভেজা হয়েছি। আম কুড়াতে কুড়াতে এইবাগান সেই বাগান করে পুরো গ্রাম ঘুরেছি। হয়তো বেশি বৃষ্টির কারণে গাছওয়ালা বাগানে আসেনি অথবা বাড়ির নিচের দুইটা গাছ ছিল-সেখানে যায়নি, অথচ ভিজতে ভিজতে সেসব জায়গাতেও আমি-আমরা যেতাম নিজ দায়িত্বে। পাড়ার ছেলেদের সাথে গাছের জাম্বুরা পেড়ে অথবা খালি পায়ে পুরনো-তালি দেওয়া ৫নং ডিয়ার ফুটবলটা নিয়ে আমবাগানে বৃষ্টিতে ভিজেছি, স্কুল, কলেজ, বাজার, মাঠ সবজায়গা থেকে ফেরার পথেও বৃষ্টির কাছে মাথা নত হয়েছে। কখনও ইচ্ছাতে কখনও অনিচ্ছায়। কোন কিছু দিয়ে মাথাকে বৃষ্টি থেকে আড়াল করলেও একটু পরেই যখন জামার ভেতর দিয়ে আস্তে আস্তে প্যান্ট দিয়ে পানি গড়িয়ে নিচে চলে যেতো, আহ! সেই অনুভূতি প্রকাশ করা যায়না। গ্রাম ছেড়ে কুষ্টিয়া শহরে আসার পরও অনেক বার ভিজেছি। আমাদের কলেজ মাঠে, সরকারী কলেজে, আমাদের মেসের গলিতে। ঢাকাতেও কয়েকবার জেনেভা ক্যাম্পের কিশোরদের সাথে শ্যামলী মাঠে ভিজেছি। খোলা মাঠে চিৎ হয়ে শুয়েও ঝমঝমে বৃষ্টিকে বুক পেতে নিয়েছি। 
দুই। দ্বিতীয়টা যেভাবে উপভোগ করতাম তা হলো পরোক্ষ ভাবে, এখানে দুঃখজনকভাবে 'ভাবটা' মুখ্য। অর্থাৎ বৃষ্টি দেখে বা কাউকে ভিজতে দেখে। ঢাকাতে অফিসের বারান্দা থেকে সামনের মাঠে বৃষ্টিতে ভেজা আমার একটুকরো ছেলেবেলা দেখেছি। কীভাবে যে ঐ মুহুর্তগুলো আমার কেটেছে তা বোঝানো যাবে না। বাসের ভেতরে বসে রিকসাওয়ালার নিরুপায় ভেজা, অবাধ্য বৃষ্টিকে পথচারীদের বাধ্যছেলের মতন মেনে নিয়ে ভেজা, বাচ্চার মাথায় ছাতা ধরে বাবা-মায়ের ভেজা, ফেরিওয়ালার পণ্যকে বাঁচিয়ে নিজেকে সঁপে দেওয়ার ভেজা, পাখিদেরকে একটা পাতার নিচে ঘুপটি মেরে বসে ভেজাও দেখেছি। এছাড়া টিনের চালে বৃষ্টির শব্দকে পুরো ছোটবেলা জুড়েই উপভোগ করেছি। আমাদের টিনের চালে ফুটো থাকাতে সেখান দিয়েও মাঝে মাঝে পানি পড়ত। সেটা অবশ্য সুখকর ছিল না। তবে শেষের দিকে মনে মনে চাইতাম যেন ঝড় বৃষ্টি একসাথে না আসে। চালটা ভেঙে পড়েনা যেন। সেই সময়ের বৃষ্টি কিছুটা আতঙ্কের ছিল। কৃষকের ছেলে হবার কারণে মাঠের ধানকে অতিরিক্ত বা অসময়ের বৃষ্টির কাছে পরাজিত হতেও দেখেছি।  হাত বাড়ালেই যেখানে বৃষ্টিকে ছোঁয়া যেত সেসব জায়গাতে আমি ছুঁয়েছি। অফিসের ছাঁদে, বারান্দায়, বাসের জানালার ফাঁকে, এমন অনেক হয়েছে যে আমি জানালা খুলে দিতাম যেন আমার গায়ে এসে পড়ে কিছুটা। বৃষ্টিতে ভেজা বা এই শব্দকে উপভোগ করার সময়টা আমি আমাকে অনেক বার উপহার হিসেবে দিয়েছি। 
কি সৌভাগ্য আমার। সৃষ্টিকর্তা তার এই অসামান্য নিদর্শনকে তার আরেক সৃষ্টির কাছে উপভোগ্য করে পাঠিয়ে দেয় এখনো-এখানেও। জাপানে টিনের ঘর আছে কিনা খেয়াল করিনি। কিন্তু আমার বাসার বারান্দা আর উপরে ওঠার সিঁড়ির ছাউনিটা টিনের (টিনের মতন)। 
ভাবতে পারেন? ভাবতে পারেন টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আমাকে কীভাবে ভালবাসে? 
পুরনো প্রেমিকা ভুলে গিয়ে চলে গেলেও বৃষ্টি আমার কাছে প্রতিবারই ফিরে আসে নতুন ছন্দে।
তবে... তবে... 
আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখি যে, বৃষ্টি শেষের কোন এক সন্ধ্যেবেলায়। আমি ভিজে চুপচুপে একাকার হয়ে পা টিপে টিপে ছেঁড়া স্যান্ডেলটা হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছি..  অপেক্ষা করছি কখন বারান্দায় বসে থাকা দাদা আমাকে দেখে বলবে 'এই তোর এতক্ষণে বাড়ি ফেরার সময় হলো?'
ছোটভাই রিংকু হয়তো দাদার কোলে বসে মুড়ি খাবে- খুব নিরাপদে। 
দাদী বাড়ির হাঁস-মুরগীগুলোকে খেতে দিতে দিতে রাগ করে বলবে 'টপ করে ঘরে যা, তোর বাপ বসে আছে দেখ যেয়ে কি করে!'
বাড়ির কুকুরটাও ধানের গোলার নিচ থেকে আমার দিকে অভিযোগ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। গোয়ালঘর থেকে ময়না আর কাল দুইটা খাসি ছাগল ভ্যা ভ্যা করবে আমাকে দেখে। 
আব্বু হয়তো শাসানোর আগেই মা এসে কান ধরে নিয়ে যাবে কলের পাড়ে... 
আচ্ছা, এখন তো বৃষ্টি হচ্ছে, আমি যদি আবার ভিজি? যদি আবারও কাদা লাগে ? ধুয়ে দেবে মা?

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.