Header Ads

বাবা দিবস ২০১৬

বাবা দিবস ২০১৬

সত্যি সত্যি কয়েক দিন ধরে আমার পিঠ চুলকাচ্ছে। ইদানিং সেহরী খেতে উঠে শরীরে একটু হালকা পানির ছটা দেই যখন, ফ্যানের নিচে বসার পর তখন হালকা হালকা সুড়সুড়ি লাগে পিঠে। গায়ে লেগে থাকা পানি শুকিয়ে গেলেই পিঠে, কাঁধের উপরের অংশটুকুতে হাতের স্পর্শ অনেক ভাল লাগে। পিঠটা যখন চুলকায় তখন আব্বুর হাতটা মিস করি। বাড়িতে যখন একসাথে রাতের খাবার খেতাম, তখন এমন অনুভূতি হলে আব্বুকে বলতাম “আব্বু এই জায়গাটাতে একটু হাত বুলায়ে দাও তো!”
আব্বু ঠিক যে জায়গাটাতে হাত বুলানো দরকার, কিভাবে যেন সেইখান বরাবরই হাত রাখতেন। আমি তারপরেও বলতাম “না, না! ঐখানে না। আরেকটু উপরে! না না, আরেকটু ডানে, ডানে। না না হালকা একটু বাম দিকে”
বাসের হেলপারের মতন এমন দিক নির্দেশনায় আব্বু বিরক্ত হতো না, বরং সারা পিঠটাই হাত বুলিয়ে দিতো।
আরেকটা সময় আব্বু নিজেই আমার পিঠের খোঁজ নিত। সেটা অবশ্য অন্যরকম কাহিনী। রিংকুর সাথে আমার ঝগড়া অথবা আম্মুর কোন হুকুম না শুনে পাড়ার ভাই-বেরাদারদের সাথে খেলায় মেতে থাকা সহ আরো সহস্র কারণে বাপের হাতের ছোঁয়া পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। দুষ্টামির মাত্রা বেশী বেড়ে গেলেই আব্বু ওয়ার্নিং দেয়, “মাইর খাওয়ার জন্য পিঠ চুলকাচ্ছে?? চুপ করে বস!”
কিন্তু আমিতো আর চুপ করে বসে থাকে ছেলে না। না ঐ কালে, আর না এই কালে। ছোটবেলা থেকেই আমি পড়াশোনার ধারেকাছেও যেতাম না। পড়া ফাঁকি দেয়া দুরন্তপনাই ছিল একমাত্র পরম কর্ম। আব্বু আমাকে শাসাতো “পড়াশোনা না করলে একদিন দুম করে সাইকেলের পেছনে করে নিয়ে গিয়ে আমলাতে ওয়েল্ডিঙের দোকানে কাজে লাগায়ে দিয়ে আসবো!”
কিন্তু আমি এসব ভোকাস ডায়লগে ভয় পেতাম না। এটুকু নিশ্চিত ছিলাম যে, আমার মান-সম্মানের কথা চিন্তা না করলেও বাপজান উনার নিজের মান-সম্মানের কথা নিশ্চয় ভাববে! তাই প্রতিনিয়ত এই টম-এন্ড-জেরী চলত। কার্টুনের টাইটেলের মতন করে আব্বু লেখা শিখিয়েছিল অনেক আগে একবার। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলেই হয়েছে! পড়াশোনায় মনোনিবেশ করো! পেশায় দলিল লেখক হলেও আমি জানতাম না, কয় কাঠাতে কয় বিঘা! আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলেই বলতো “তুমি নিজের লেখাপড়ায় একটু মনোযোগ দাও! এসবের দিকে মনোনিবেশ না করলেও চলবে” আমি পড়াশোনায় মনোনিবেশ না করলেও আমার পাড়ার লোাকেরা আমাকের রক্ষা করার প্রশ্নে সর্বদাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন। আব্বু যেদিন আমার ওপর চড়াও হতো, তখন আষাঢ় মাসেও পাড়ার লোকেরা তাল পড়ার শব্দ পেতো। আমার কমলা বেগম (ন দাদী)সহ আরো কিছু মানুষের কল্যাণে দুমদুম শব্দগুলো মিলিয়ে গিয়ে আমার একক ফোঁপানির সুর তৈরি হতো। এখন আমার ছোট ভাই সেই সুরে আশেপাশে না গিয়ে, শুধু ফোঁসফোঁস করে। যখন মাঝে মাঝে ছোটভাইটা কে একটুআধটু শাসন করতে যাই, তখন চিন্তা করি আব্বু কিভাবে যে সহ্য করতো আমাকে। এত্তো এত্তো বাঁদরামি করেছি হাইস্কুল জীবনে, এর কোন হিসেব কষে বের করা যাবে না। ক্যামনে সহ্য করেছে আব্বু আমাকে! ভাবতেই পারিনা। আমিতো ছোটটাকে শুধু মাত্র আমার কথা চিন্তা করেই ছেড়ে দিই। ও কে এখন ছেড়ে দিলেও হাইস্কুল পরীক্ষার পরে সেই যে বাড়ি ছাড়লাম, আর আব্বুকে কাছে পাওয়া হলো না। আব্বুর হাতের ছোঁয়া পাওয়া হল না। তবে একবার পেয়েছিলাম আচ্ছা মতন। কলেজের শেষে গাজীপুরে এডমিশন দিতে যাওয়ার সময়ের কথা। রাত একটার সময়ে ট্রেন ছিল পোড়াদহ থেকে। মিন্টু চাচার চারতলা বাসা থেকে বিদায় নিয়ে যখন নামতে ছিলাম তখনকার সময়টা । দুইতলা পর্যন্ত নামতেই হঠাৎ করে বুকের ভেতরটায় ধস করে উঠেছিল সেদিন। মনে হয়েছিল যেনো, অনেক অনেক দূরে চলে যাচ্ছি, অনেক দিনের জন্য। পা দুটোকে সামনে আর এগোতে পারছিলাম না। ব্যাগ রেখে উপরে ছুটতে লাগলাম। গেটের কাছে পৌঁছে দেখি আব্বু জানালার গ্রীল ধরে ষ্টেশনের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আর আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। আব্বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম অনেকক্ষণ। চোখের পানি আসার টাইমিংটা যতটা ভালো ছিল, ঠিক ততটা খারাপ টাইমিংএ ট্রেনের সাইরেন শোনা গেলে আব্বুকে ছেড়ে আসতে হয়েছিলো। সিরাম কষ্ট হয়েছিল সেদিনটাতে। কিন্তু কষ্টের চেয়ে ভালো অনুভূতির ব্যাপারটাই বেশো বোধহয়।
আব্বুর কন্ঠে গুণগুণ করে গান, আব্বুর ছবির অ্যালবাম, বই-এর সেলফ আর আব্বুর মুখের মজার মজার গল্প। এইসবগুলোই আমার এই জীবনের অনুপ্রেরণা। আম্মু কিন্তু জানে, আমি আব্বুকেই বেশী ভালোবাসি। আব্বুকে আজ কল করে অনেক ইনিয়ে-বিনিয়েও “বাবা দিবসের শুভেচ্ছা” কথাটা বলতে পারিনি। আব্বুকে অবাক করে দিয়ে শেষ মুহুর্তে দোয়া চেয়ে বসেছি।
এখন ঢাকাতে আমার রুমের ওয়ারড্রোবের কাঠের সাথে নিজের অজান্তেই পিঠটা একটু ঘষে নিই। আর প্রতীক্ষায় থাকি ঈদের। ঈদই কেবল পারে এক মুহুর্তের জন্য আব্বুর বুকে ঠায় করে দিতে, আব্বুকে ছোয়ার সুযোগ করে দিতে।
আরেকভাবে সুযোগটা পাওয়া যেতে পারে, পা মচকিয়ে শয্যাগত হলে। এবার পা মচকিয়ে বাড়িতে গিয়ে আব্বুর হাত বুলানো পেয়েছি।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.