Header Ads

মায়ের গন্ধ


মা জিজ্ঞাসা করলো, কি লাগবে তোমার??আমি বললাম, "তোমরা যেই গামছাটা দিয়ে সারাদিনে হাত পা মুখের ময়লা মুছে ফেলো, যেই গামছাটাতে লেগে আছে আমার আব্বুর পরিশ্রান্ত শরীরের ঘাম, নামাজের জন্য অজু করার পরে গায়ে লেগে থাকা পানি, রান্নার পরে হয়তো কিছুটা হলুদ মসলার গুঁড়ো মাখানো হাতের ছোঁয়া, সেই গামছাটা দিয়ো। দাদা বেঁচে থাকতে যে লুঙ্গিটা পড়তো, সেই লুঙ্গিটা দিও। আর তেমন কিছুই লাগবে না মা, এখানে সবই পাওয়া যায়। শিঙ্গাড়া, ফুচকা, পোলাও, বিরিয়ানি, গরু, মুরগী, ছাগল, মাছ, ভাত, ডাল শাক-সবজি সবই, সবই পাওয়া যায়।
খুবই কাছের বড় ভাই প্লাস এক্স-কলিগ মশিউর ভাই জাপানে এলে উনার কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে ওটা খুলে দেখার আগ্রহ কমাতে পারলাম না। এদিকে আমার শেষের ট্রেনটা ধরতে হবে। অগত্যা যত্রতত্র ব্যাগটা নিয়ে দৌড় দিলাম কিন্তু ট্রেনের ভেতরে ঢুকেই ব্যাগটা খুলে দেখা থেকে কোনভাবেই নিজেকে বিরত রাখতে পারলাম না, কাটাকাটি শুরু করে দিলাম। আস্তে আস্তে বের হয়ে এলো মায়ের হাতের যত্নে বেঁধে দেওয়া অনেকগুলো পোঁটলা। আমার শশুর বাড়িতে আমার মায়ের পোঁটলা বাঁধার বেশ সুনাম রয়েছে। আম্মু নাকি অনেক সুন্দর করে এটা সেটা বেঁধে দিতে পারে। পারবেই না-ই বা কেন? সেই ছোট্ট বেলাতে যখন সাইকেলের হাফ প্যাডেল ঠেলে ঠেলে মামা-খালাদের বাড়ি যেতাম, তখন থেকেই ব্যাগ টানছি। আমার মা সহ আমার মামীদের-খালাদের সবারই পরস্পরের বাড়িতে ব্যাগ বেঁধে না দিলে পেট ভরতো না। একবার তো নজিবপুরে গেলাম দাদার শশুর বাড়ি, কোন এক শালা (দাদার শালা আসলে) এসে দেখি আমার সাইকেলের পেছনে কাঁঠাল বেঁধে দিচ্ছে। আমি কোন মতে টেনে এনে তওবা করলাম যে আর কখনো ঐ শালাদের বাড়িতে যাবনা। পরে অবশ্য অনেক গিয়েছি তবে সাইকেলের পেছনে না বেঁধে সামনের হ্যান্ডেলের সাথে ব্যাগ ঝুলিয়ে দিত। নানীর বাড়ি-খালার বাড়ি বেড়ানো শেষে ফেরার সময় হয়ত খালা ক্ষেতের ফসল-শাকসবজি (আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা, সরিষার তেল, ডালসহ) মামীরা গাছের পেয়ারা ছিঁড়ে দিয়েছে, আম পেড়ে দিয়েছে, মাটির নিচের মিষ্টি আলু দিয়েছে, কালাইয়ের ডাল দিয়েছে, গাছের লেবু তুলে দিয়েছে- ও! হ্যাঁ ব্যাগ খুলতেই আমার বাড়ির গাছের লেবু চোখে পড়ল। ছোট বেলায় আব্বু সন্ধ্যার আগে আর আমি সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরলে, খবরই ছিল সেদিন আমার। আমাকে একদম বাড়িছাড়া করেই ছাড়ত। আমি লেবু গাছে্র নিচে যেয়ে লুকিয়ে থাকতাম, মা কিছুক্ষণের ভেতরেই বের হয়ে আসত উৎকণ্ঠা নিয়ে। কবি! এএএ কবি! বাড়ি আয় বলছি। আয় আর মারবে না তোর আব্বু! আয়! বাড়ি আয়! সন্ধ্যা হয়ে গেলো। পোকামাকড় কামড় দেবে, আয়!
লেবুর গন্ধটা সেই সেরকমই আছে। পাল্টাইয়নি। লেবুর আকার ঠিকই আছে, আমার আকার পাল্টেছে।





ব্যাগের ভেতরে আরেকটা ব্যাগও আছে দেখি। হুম, আমাদের বাড়িতে ব্যাগ বিলাস হতো। দাদার ব্যগটা ছিল ধবধবে সাদা আর বড়। আমাদেরটা ছোট। শুক্রবার এলেই দাদার পেছন পেছন ব্যাগ নিয়ে বাজারে যেতে হতো। হেল্পার হিসেবে। দাদা দরদাম করত, আমি ব্যাগ ধরলে তাতে আলু, পেঁয়াজ, মরিচ, মাছ, শাক সবজি সব ভরে যেতো। এরপর দাদা আমাকে ১ টাকা দিত কখনও ২টাকা। আমি খোরমা কিনে খেতাম অথবা বড়া ভাজা। আম্মু আমাকে খোরমাও পাঠিয়েছে।

আরেকটা ব্যাগের ভেতরে কয়েকটা কাপড় চোখে পড়লো। খুবই সাবধানে হাতে নিয়ে ব্যাগটা গিট্টু খুলে সরাসরি নাকের কাছে এনে ব্যাগটা মেলে ধরলাম। মুহুর্তের ভেতরে ট্রেনের গতি বেড়ে ১০০,০০০ কিলোমিটারে, আর আমাকে এক সেকেন্ডে নিয়ে গেল সেই ৪৭৬৮ কিলোমিটার দূরে, হৃদয়পুরে। যেন সেই ছোট বেলা থেকে এ পর্যন্ত বাড়িতে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত চোখের সামনে ভেসে উঠল। চোখ খুলতেই দেখি যে শেষ ষ্টেশনে চলে এসেছি। কোনমতে বাসায় এসে ব্যগখুলে দেখি এ যেন এক গুপ্তধন পাঠিয়েছে আমার মা -আমার জন্য। বাড়ির কবুতরের মাংশ পুড়পুড়ে ভেজে পাঠিয়েছেন, ছোলার ডালের হালুয়া, নারিকেলের বিস্কুট পিঠা, কিছু তেজপাতা, আমার দাদীর গাছের লেবু, বাড়ির গাছের আমের দুই পদের আঁচার, প্রিয় নাড়ু আর খোরমা। ঐ মুহুর্তে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা আর সবচেয়ে স্বাদের খাবার ছিল ওগুলো। মা আমার সবটুকু ভালবাসা ঢেলে দিয়ে খাবার বানিয়ে পাঠিয়েছে। একবার খুলনায় এইচএসটিটিসি/টিটিসিতে ট্রেনিং দিতে গিয়ে রুইমাছ রান্না খেয়ে এসে মা-কে বলেছিলাম তোমার রান্নার চেয়ে ঐ ম্যাডামের রান্না সবচেয়ে বেস্ট! কিন্তু আজ বুঝলাম মায়ের হাতের খাবার বলতে আসলে হয়ত কেবল স্বাদই না বরং খাবারের পেছনে মায়ের হাতের ছোঁয়া এবং এর মর্ম বোঝানো হয়। মা সবসময়ই একটু বেশী করে পাঠায় যাতে আমার পাশাপাশি আমার সাথের লোকজনদের নিয়ে খেতে পারি। তবে এযাত্রা আমি তা করতে চাইনি, আবার বিরত থাকতেও পারিনি। মনে আছে আমার কলেজ জীবনে মা বাড়ি থেকে প্রায় ৪০০/৫০০গ্রাম ওজনের একটা/দুইটা ফজলি আম পাঠালে পুরো ক্লাসের সবাইকে কুচিকুচি করে কেটে খাওয়িয়েছিলাম। আচ্ছা খাবার নিয়ে এতো নাড়াচাড়া না করি, নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফ্রিজে রাখি।
বরং কাপড় কি কি দিয়েছে দেখি! দুই লুঙ্গি গামছার পাশাপাশি মা আমার বালিশের উপরে রাখার জন্য একটা আলাদা সেলাই করা কাপড় দিয়েছে। আমি ওগুলোর গন্ধ নিই রোজ। আচ্ছা,
গন্ধ দূর করার জন্য তো কত কিছুই আছে দুনিয়াতে, গন্ধ ধরে রাখার জন্য কিছু নেই?

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.