Header Ads

মায়ের টেকনোলজি শিক্ষা- ১০১


বিদেশে আসার পর প্রথম যেটা করতে হয়েছে সেটা হল আম্মুকে টেকনোলোজির সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়া। বাটন মোবাইল ছেড়ে স্পর্শকাতর মোবাইলে যাওয়া। তাছাড়া দেখে দেখে কথা বলা বা ভিডিও কল সম্ভব না। এই বড় পরিবর্তনটাতে অনেক ঘটনা অনেক শব্দচয়ন হয়ছে যা বিভিন্ন সময়ে আমাদের উভয়পক্ষের আনন্দের কারণ হয়েছে। তার ভেতরে কিছু এমন:

(আমাদের ঘরের ভেতরে ইন্টারনেট কাজ করেনা, তাই কথা বলতে চাইলে বাড়ির সীমানা পার হলে দেশের ১নং নেটওয়ার্কের ইন্টারনেট সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ আমিও বিকেলের পরে আম্মুর সাথে কথা বলতে পারতাম না, সন্ধ্যা হলেই টাইম শেষ।বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৬টা হলো জাপানে রাত ৯টা)

১। সমস্যাঃ জাপান থেকে মোবাইল নম্বরে কল দিলে ৮ সংখ্যার একটা র‍্যান্ডম নম্বর ওঠে, আম্মু প্রতারক চক্রের কল ভেবে রিসিভ করে না। সমাধানঃ আমি ছোটভাইকে অথবা আইরিনকে কল দিয়ে আম্মুকে ফোন রিসিভ করতে বলি। 

২। সমস্যাঃ আমার জাপানে ব্যবহার করা মোবাইল নম্বর আর ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেশে কল দেওয়ার নম্বর ভিন্ন, আম্মু গুলিয়ে ফেলে। মাঝে মাঝে দুই নম্বরই ধরে, কখনও কোনটাই না।
>মোবাইল নম্বর থেকে কল দেওয়ার মানে হচ্ছে- কল ধরার দরকার নেই >ইন্টারনেটে আসো-মেসেঞ্জারে কল দিব।
ইন্টারনেট নম্বর দিয়ে কল দেওয়ার মানে হল- যাইহোক না কেন কল রিসিভ করো।
আম্মু কোন কারণে ভয়ে ভয়ে যেটা মানা, সেটা ধরে ফেলে।
সমাধানঃ আমি ছোটভাইকে কল দিয়ে আম্মুকে ফোন রিসিভ করতে বলি।

৩। সমস্যাঃ আম্মু একবার মেসেঞ্জার থেকে বের হয়ে গেলে আর ফিরে আসতে পারে না। মেসেঞ্জারের কলের ইন্টারফেসটা মিনিমাইজ হয়ে যাওয়াতে আর আমাকে খুঁজে পাইনা।
সমাধানঃ আমি কেটে দিয়ে আবার কল দিই। 

৪। সমস্যাঃ কানে হেডফোন দিলে সুড়সুড়ি লাগে তাই লাউডস্পিকার বা নরমালিই কথা বলতে হয়, তবে বেশ অনেকবার চেষ্টার পর এখন সহজ হয়েছে বিষয়টা। তবে সেদিন আম্মুকে বললাম হেডফোনটা খুলে আবার লাগাও। আম্মু কান থেকে হেডফোন খুলে আবার পরলো। হাহা 
সমাধানঃ এইভাবে হেডফোন খুলে আবার লাগালে সমাধান হবে, আশা করেন?

৫। সমস্যাঃ ইন্টারনেট কল বা ফোন কল যেকোন কিছুর জন্যই আম্মুকে ঘরের বাইরে যেতে হয়, অর্থাৎ একে তো আমি দেশের বাইরে, তারপর আবার কথা বলতে ঘরের বাইরে এমনকি বাড়ির বাইরেও চলে যেতে হয়। যেদিন বাড়িতে ওয়াইফাই নিলাম সেদিন থেকে আম্মু ঘরে বসে কল দেয়, সকাল সন্ধ্যা যখন ইচ্ছা কল দেয়, কি রান্না করলো, কি খেলো সবই দেখায়। আমার খুবই ভাল লাগে। আম্মু শুধু একটা কথাই বলে 'আমার ছেইলি আইজ ঘরে আইয়িছে' অর্থাৎ 'আমার ছেলে আজ ঘরে এসেছে'। পারিশা তো একদিন আমার সাথে বাগানে হাটতে হাটতে ফোনে কথা বলতে যেয়ে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল- আমদের পোষা কুকুর টমেনের কারণে রক্ষা সেদিন।
সমাধানঃ ওয়াইজলি আম্মুকে ঘরে এবং ওয়াইফ হারানো রোধকল্পে সম্ভব হলে বাড়িতে ওয়াইফাই নেওয়া ভাল।

৬। সমস্যাঃ আম্মু বাস্তব জীবনে শিক্ষিত হলেও মোবাইল ব্যবহার শিক্ষাতে আম্মুকে এখন প্রাইমারী থেকে সেকেন্ডারি স্কুলে তোলার সময়। আম্মু আমাদের মেসেজ লিখতে চায়। চ্যাট করতে চায়। তাহলে বাংলাতেই হোক। যুক্ত বর্ণ না লিখতে পারাতে আম্মু জিনিয়াস একটা বুদ্ধি বের করেছে। একমাত্র বোন 'শ্রাবনী' লিখতে অসুবিধা হওয়াতে ওর অন্য নাম 'আমেনা' লেখে। 'বৃষ্টি' হচ্ছে না লিখে 'পানি' হচ্ছে লেখে, এইরকম আর কি। 'আসসালামুআলাইকুম' লেখা শিখিয়েছিলাম যেই ক্লাসে আম্মু সেই ক্লাসেই শিরিন ফুপুর কাছ থেকে সালাম পান, এবং উত্তর না শিখে যাওয়াতে খুব অভিমান।
সমাধানঃ বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দ অভ্রতে লিখিয়ে চর্চা শেষে এখন ঝাক্কাস মেসেজ লিখতে পারে। এবং খুবই সুন্দর করে লেখে।
তবে সাধু সাবধান, আব্বুর একাউন্ট আব্বুর নামে হলেও কিন্তু আম্মু চ্যাট করে। লোকে ভাবে 'আরে রবি ভাই মেসেজ দিয়েছে দেখি!' পরে কল দিয়ে দেখে 'কবির মা'। আব্বুর চেয়ে এই বিষয়ে আম্মু এগিয়ে গেলো। তবে আম্মুর এ+পাওয়াতে শিক্ষকের তালিকা ছোট না কিন্তু। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং টিউটরদের তালিকা ভারি করেছে আইরিন, পারিশা, রিংকু, শ্রাবনী এবং লিমন। আমার এই ছাত্রীকে শেখানোর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি আপনাদের কাছে দিলাম, হাড্ডি আমার মাংশ আপনাদের।  

আম্মুকে বেশিক্ষণ শেখাতে গেলে কখনো কখনো ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে, বাহানা বানায় (অন্তঃত আমি তাই ভাবতে পছন্দ করি)। কখনো বলে ঘুম আসছে, কখনো বলে কাজ আছে অথবা আবার পরে শিখবো ইত্যাদি। আমি তখন পুরনো দিনের সুরে বলি ''সারাদিন ঘুরে বেড়ালে সমস্যা হয়না, আর পড়তে বসলেই তখন ঝিমুনি? খালি ফাঁকি দেওয়ার তালে থাকো, না? আজ আসুক আব্বু!'




কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.