Header Ads

ভ্যাকসিন/ওয়াকুচিন সমাচার

 ভ্যাকসিন/ওয়াকুচিন সমাচার

_____________________________


আজকে করোনা ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ সম্পন্ন করলেও এইটার কাহিনী শুরু হয় আরো মাস দেড়েক আগে। 

তার আগে বলে নিই যে, আমি কেন এই লেখা লিখছি। 


শিরোনামঃ

১। যেহেতু ভ্যাকসিন দেওয়ারকালীন কোন ছবি তুলিনি তাই এই ভ্যাকসিন আমার শরীরে কাজ করবে কিনা সেই শঙ্কা নিয়ে ভাবলাম অন্তত কিছু লিখি, তাতে করে যদি কোন কাজ হুয়। 

২। আমার প্রিয় প্রতিবেশী নাকামুরা-সানের অবদানের কথা 

৩। কীভাবে জাপানে ভ্যাকসিন দিচ্ছে-সেই অভিজ্ঞতা


বিস্তারিতঃ 

১। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় ইভেন্ট অলিম্পিক হচ্ছে আমার শহর টোকিও-পুরে। যেখানে আমি কাজ করি সেই কোম্পানি এই ইভেন্টের গোল্ড পার্টনার। অথচ খুবই আফসোস যে একটা খেলাও দেখতে পারছি না করোনার কারণে। বাংলাদেশিদের আর্চারি, সাঁতার খেলা আর প্রিয় ব্রাজিলের ফুটবল দেখার সুযোগ হলোনা। কোথায় ভেবেছিলাম অলিম্পিকে যেয়ে স্টেডিয়ামে বসে একখানা দাঁত বের করে ছবি তুলে পোষ্ট করবো, তাও হলো না। এমনকি বিশ্বের আরেকটা বড় চলমান ঘটনা মহামারি করোনা-টিকার সিরিঞ্জ পুশ করা অবস্থায় ব্যাথাময় মেকি হাসির একটা ছবি তুলবো ভেবেছিলাম, সেটাও হলো না। এই মূহুর্তে করোনার মতন শক্তিশালী আর বিধ্বংসী এই মহামারির হাত থেকে বেঁচে থাকার জন্য উছিলা হিসেবে এই দুই সিরিঞ্জ টিকা নেওয়ার ছবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। তাছাড়া এই ছবি ইতিহাসের সাক্ষী বলে সংরক্ষণ করে রেখে পরবর্তী প্রজন্মকে স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় হাতের 'উরুসন্ধি' দেখানোর চিন্তা খুবই শোভাবর্ধন করে বলে আমি মনে করি। সঙ্গত কারণে ছবি তুলিনি (আসলেও কি তাই?), তাই দু কলম লিখে এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করলাম। 


২। আমার প্রতিবেশী জাপানিজ বুড়োবুড়ি নাকামুরা-সান আর ইউমিকো-সান। আমাদের কী পরিমাণে ভালবাসা তা লিখতে গেলে দিস্তা দিস্তা পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে (মানে কম্পিউটারে লিখে সেটা যদি প্রিন্টও করি-তবুও আর কি)। উনি বয়সে প্রায় ষাটোর্ধ মানুষ হওয়াতে শুরুর দিকেই টীকা পেয়ে গেছেন। একদিন আমাকে ডেকে দুইটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। 

এখানে আগে বলে নিই টীকা দেওয়া প্রক্রিয়ার কথা। আপনি যেখানে থাকেন সেই শহরের সিটি অফিসে আপনার নাড়ির খবর আছে, বাসায় কয় থাকে সেখবরও আছে। তারা প্রতিটি মানুষের নামে চিঠি পোষ্ট করে দেন। খামের ভেতরে কয়েক ধরণের কাগজ থাকে যা নিম্নরূপ

ক। দুই ভ্যাকসিনের জন্য দুইটা ব্ল্যাংক ফরম যেখানে আপনার নাম ঠিকানা, টিকা দেওয়ার সময়ের তাপমাত্রা,  আপনার টিকা নিলে কোন সাইড-ইফেক্ট দেখা দেয় কিনা ইত্যাদিসহ আরো প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য।

খ। টীকা নেওয়ার আগে ও পরে যা যা খেয়াল রাখতে হবে এবং কোন কারণে অস্বাভাবিক কিছু দেখা দিলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে সেই তথ্য।

গ। যে কোম্পানির টিকা দিচ্ছে-সেই টিকা সম্পর্কিত যা যা আপনি জানতে চান, প্রায় সব তথ্যবহুল আরেকটি লিফলেট টাইপের কাগজ। 

ঘ। আপনি যে শহরে বাস করেন, সেই শহরে অবস্থিত অনুমোদিত টীকা কেন্দ্র সমূহের নাম ও সচল মোবাইল নম্বর

ঙ। একটা টেম্পোরারি সার্টিফিকেট যেখানে টীকা দেওয়ার পর একটা স্টিকার লাগিয়ে দেবে যে আপনি কোন ডোজটা আসলে দিয়েছেন সে সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে


এখন ফিরে আসি  নাকামুরা-সানের কাছে। উনি যখন টিকার চিঠি পেয়েছেন এবং দেওয়া সম্পন্ন করেছেন তখন ক নম্বরে উল্লেখিত ব্ল্যাংক ফরমের দুইটা কপি আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন। তখনও কিন্তু আমাদের চিঠি আসেনি, কারণ আমাদের বয়স কচি লাউয়ের মতন। 

আমাকে ফরম দুটি দিয়ে বললেন ওইগুলো পূরণ করে রাখতে। অনেকটা ট্র্যায়াল দেওয়্রার মতন আর কি। যেহেতু আমি জাপানিজে কাঁচা পেঁপে তাই কষানি দিলেও জাপানি বের হতে চায়না খুব একটা। আগে থেকে কাগজে কলমে ফরম ভরে রাখলে অরিজিনাল ফরম আসলে তখন ফটোকপিরটা দেখে দেখে লিখে ফেলা যাবে, তাই এই ব্যাবস্থা।

আজ থেকে প্রায় দেড় মাস আগে আমাদের টিকার চিঠি আসলে আমরা ফরম পূরণ করলাম। নাকামুরা সান আগেই চেক করে রেখেছেন। এরপর আমাকে পরামর্শও দিলেন ঘ নম্বরে উল্লেখিত অনুমোদিত টীকা কেন্দ্র থেকে একেবারে বাড়ির কাছের টিকা কেন্দের মোবাইল করে রিজার্ভেশন দিয়ে রাখতে। আমাকে এটাও বলে দিলেন কোনটা সবচেয়ে কাছে। আমি কল দিলে অপর পাশের মহিলা বললেন যে যেহেতু এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় তাই জাপানিজ ভাষা জানা কাউকে নিয়ে আসো।

আমি মহিলাকে বললাম আমার প্রতিবেশী নাকামুরা-সান আছেন তবে এখন সন্ধ্যার কাছাকাছি, আমি তাকে বিরক্ত করতে চাইনা। মহিলা বললেন, তাহলে আগামীকাল সকাল ১১টাতে আমাকে কল দিবেন। 

পরদিন সকালে যথসময়ের কিছুক্ষণ আগেই কল দিয়ে বললেন, নাকামুর-সান কোথায়? আমি অবাক হলাম যে মহিলা আমার প্রতিবেশির নামও মনে রেখেছেন। অতঃপর নাকামুরা-সানকে ডেকে দিলে উনি বুঝিয়ে দিলেন। আগস্টের ২ আর ২৩ তারিখে সকাল ১১টাতে আমাদের আগে থেকেই ফরম পূরণ করে টিকা কেন্দের উপস্থিত হতে হবে। আমার অফিসের অনেকেই আমার আগে টিকার চিঠি পেয়েও এখনো টিকা পায়নি বলে জানি। নাকামুরা-সান আমাকে তাড়াতাড়ি টিকা নিতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সর্বপরি সাহায্য করেছেন বলেই এই অনেকের চেয়েই আমাদের টিকার প্রথম ডোজ আজকে ছবি তোলা ছাড়া সম্পন্ন হলো। 


৩। কীভাবে জাপানে ভ্যাকসিন দিচ্ছে-সেই অভিজ্ঞতা আসলে মোটেও কষ্টের না। ১০০ টাকা কামাই করলে সরকার ১৮ টাকা কেটে নেয়। বিনিময়ে ৩৬ টাকা পরিমাণ সুবিধা দেয় বলে আমি ধারণা করি। আমি এমন দেশ থেকে এখানে এসেছি  যেখানে নাগরিক সুবিধার অবস্থা কেমন তা আমি বলে পাঠকদের কাঁটা-ঘায়ে লবন ছিটিয়ে না দিই। তো এমন একটা জায়গা থেকে এসে আমি সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধা প্রাপ্ত হয়ে যারপরনাই আনন্দিত। প্রায় ৩ বছরের জাপান-জীবনে কোন দিন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিবহন-যোগাযোগ সর্বোপরি মানুষের বেঁচে থাকার যে ৫টি মৌলিক অধিকার রয়েছে  তার কোনটারই অভাব আমি এই দেশ থেকে পাইনি। বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি হিসেবে হাজারো অভিযোগ থাকলেও দিন শেষে মা বলে ডেকে দুষতে পারিনা। 

যাহোক, আমার বাসার ঠিক কয়েক ঘর পরের ঘরই আসলে ক্লিনিক। দেড় মাস আগে বুকিং দিয়ে রেখছি যে আজ সকাল ১১টাই যাব। গুগল ম্যাপ বলছে হেঁটে গেলে ২ মিনিট লাগবে। অতপর সকাল সকাল মিয়াঁ-বিবি টীকা কেন্দ্রে হাজির হলাম। খুবই ছোট-খাটো একটা ক্লিনিক। পুরো ক্লিনিক পোড়ালে এক গামলা ছাই হবে না-এতোই ছোট। ভেতরে গিয়ে ৭/৮ জন বুড়োবুড়ি পেলাম । কয়েক মিনিটের ভেতরেই আমাদের ডাক আসলে আমাদের মেডিক্যাল ইনস্যুরেন্স কার্ড আর বাসায় যে চিঠিটা এসেছিল তা রিসিপসনিস্ট মহিলার হাতে দিলাম। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম তার পাশেই আয়নার মতন দেখতে আমার মুখের উচ্চতায় একটা থার্মাল ক্যামেরা আছে। সেখানে তাকাতেই আমার শরীরের তাপমাত্রা স্ক্রিনে উঠে এলো। উনি সেটা দেখে আমাদের ফরমে লিখে নিলেন। এরপর ডেস্কের সামনের বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। আমরা সেদিকে গিয়ে অপেক্ষা করতেই ১১ টা বাজার কয়েক মিনিটের ভেতরেই ডাক দিলেন ভেতরে। ভেতরে স্থানসংকুলান হচ্ছিল না দেখে এক্স-রে এর রুমে বসিয়ে দিলেন। আরেক মহিলা এসে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা এর আগে টিকা নিয়েছি কিনা বা নিলে সেগুলোর কোন সাইড ইফেক্ট হয়েছিল কিনা। কোন কিছুতে এলার্জি আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে মনের ভেতরের অব্যক্ত কথাগুলো চেপে রেখে বললাম 'আমি ঠান্ডা আর বউ ময়লা'। এরপর উনি আমাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন, ডাক্তার আমাদের  জিহ্বা পরীক্ষা করলেন এবং টিকা পরবর্তি কোন অসুবিধা হলে যেমন মাথা ব্যাথা, শরীর ব্যাথা বা জ্বর এলে কি করতে হবে সে কথা বুঝিয়ে দিলেন। এরপর টিকা দেওয়ার জায়গাতে বউকে আগে নিয়ে গেলো, এরপর আমি গেলাম। 

আরেক মহিলা এসে জিজ্ঞাসা করলেন কোন হাতে দেবেন? আমি বললাম যেকোন একটা হলেই হলো। উনি জিজ্ঞাসা করলেন কোন হাত দিয়ে খাবার খাই (যেন হাগা-মুতা খুবই গুরুত্বহীন একটা কাজ), আমি ডান হাত দেখাতেই মহিলা বাম হাত চেপে ধরলেন। 

আমি নার্ভাস হয়ে গেলে উনি রিল্যাক্স হতে বললেন, আমি আল্লাহ আল্লাহ করলা,। সুঁইয়ের খোঁচা খুবই ভয়ের আমার। এর আগে একবার ঢাকাতে আম্মুর যখন অপারেশন হয়েছিল তখন আমার রক্ত পরীক্ষার সময় সুন্দরী ডাক্তারকে বলেছিলাম, “আপু, আমি এর আগে কখনও রক্ত দেইনি, ভয়ে। কিন্তু আম্মুকে তো দেওয়া লাগবেই। তাইনা?” 

ভদ্র মেয়েটি স্যাম্পল রক্ত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হতে “আপনি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকেন, ভয়ের কিছু নেই।”

আমি নিলজ্জের মতন অনুমতি চেয়েছিলাম “আপনার দিকে তাকিয়ে থাকি?”

তিনি মিষ্টিযুক্ত মুচকি হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “রক্ত নেওয়া হয়ে গেছে, আপনি কিছুক্ষন বসুন এখানে”

পরে দাঁত কেলিয়ে ছ্যাবলার মতন বলেছিলাম, “আপনি বললে সারাদিনই বসে থাকব”

যাইহোক আমার বসে থাকার প্রয়োজন হয়নি, পরীক্ষা করেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি সেদিনের কথা ভাবতে ভাবতে এদিকে জাপানিজ মহিলা সুঁই বের করে একটা ডলা দিয়ে ছেড়ে  দিলেন। এরপর একটা সবুজ স্টপওয়াচ বের করে ১৫ মিনিট সেট করে সেটা আমার গলায় পরিয়ে দিলেন। জাপান এখন পর্যন্ত ১৫টার বেশি গোল্ড মেডেল পেয়েছে তাই আমি মহিলাকে মশকরা করে বললাম 'এটা কি গোল্ড মেডেল?' মহিলা মশকরা বুঝে আমাকে আমার স্ত্রীর কাছে ফেরত পাঠাতে পাঠাতে হেসে বললেন 'সবুজ রঙের মেডেল'। 

আমরা আগের জায়গাতে ঠায় ১৫ মিনিট বসে থাকলাম, এরপর মেডেল ফেরত দিয়ে হাসিমুখে এলাম ফ্রন্ট ডেস্কে। সেখান থেকে সাবধানতার জন্য ১০০ টাকার ঔষধ নিলাম যা টিকা পরবর্তি জ্বর বা ব্যাথা উপশমে কাজে দেবে। ফেরার আগে আরেকজন এসে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে গেলেন 'নাকামুরা-সান ভাল আছেন?'



উপসংহারঃ

ধৈর্য নিয়ে আর লিখতে পারছি না, বাম হাতটা ব্যাথা করছে। গোসলে গেলাম।



কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.