রেজাউল স্যারের স্মৃতি
রেজাউল স্যারের স্মৃতি
এখনো আমার আমলা হাই স্কুলের বন্ধুদের সাথে দেখা হলে ওরা আমাকে মজা করে জিজ্ঞাসা করে, "কিরে রেজাউল স্যারের কথা মনে আছে?"
আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে ক্ষনিকের ভেতরে সামলে নিয়ে উত্তর দিই " মনে না থাকার কোনো কারণ আছে রে শালা?"
আমি ফিরে যাই ১ যুগ আগে।
তখন আমি ছাতারপাড়া স্কুল ছেড়ে আমলা স্কুলে ভর্তি হয়েছি। নতুন স্কুলে সবসময়ই উৎসুক থাকতাম। ইস্পাত কঠিন স্যার থেকে শুরু করে মখমলের মতন নরম মনের স্যার মিলিয়ে আমলা স্কুল। কোমলে কঠিনে, শাসনে ভালবাসায় মেশানো একটা জায়গা। এখানে কোন একটা ক্লাসে একদিন একজন রাগী স্যারকে সাধারণ জ্ঞান জিজ্ঞাসা পর্বে যতদূর মনে পড়ে কোন একটা প্রসঙ্গে বলেছিলাম "চীনের দুঃখ হলুদ নদী"।
রাগী স্যার আমাকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করল "নদী আবার হলুদ হয় নাকি রে?" আমতাআমতা করে বলেছিলাম "আমি যে কারেন্ট ওয়ার্ল্ডে দেখলাম স্যার"
অবাক করা ব্যাপারটা নিয়ে স্যার বলল "তুই খুঁজে নিয়ে আসবি, কোথায় পেলি এই হলুদ নদী"।
পরে আমি কারেন্ট ওয়ার্ল্ডটাই আর খুঁজে পাইনি তবে মাথায় কিন্তু গেঁথে ছিল এই হলুদ নদীর ব্যাপারটা।
এরপরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে কর্মজীবনে নেমে দেশ ছেড়ে প্রায় ৪,৮০০ কিলোমিটার দূরে এসে হঠাৎ করেই সেদিন কৌতূহলবশত মনে হল স্যারের সেই হলুদ নদীর কথা। ইন্টারনেট ঘেটে জানতে পারলাম আসলে চীনের দুঃখ বলতে বন্যায় প্লাবিত হোয়াংহো নদীকে বলা হয়। বন্যার কারণে অনেক ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে চীনকে আর এই নদীর পানির রং হলুদ হওয়ার কারণে অন্যান্য নদী থেকে একে আলাদা করা যায়। সেই কারণে একে হোয়াংহো বা হলুদ নদীও বলা হয় (হোয়াং মানেই হলুদ)।
আমার এ কয়দিনে বেশ কয়েকবার মনে হয়েছিল যে, কোন মতে রেজাউল স্যারেরRezaul Karim নম্বরটা ম্যানেজ করে স্যারকে কল দিয়ে জানাবো ব্যাপারটা। তাহলে স্যারের সাথে কথা বলাও হবে স্যারের খোঁজখবরও নেওয়া হবে। প্রায় এক যুগ পরে স্যারকে কোন ছাত্র এরকম তথ্য দিলে নিশ্চয়ই স্যার অবাক হয়ে যাবেন। ভেবেছিলাম আজকালের ভেতরেই একবার কল করব। আজকাল আজকাল করে আর হয়ে উঠলো না।
একটু আগেই জানতে পারলাম যে স্যারকে আর কোনদিনই বলতে পারব না এই কথা।
ভেবেছিলাম নদীর তথ্য দেওয়ার পরে স্যারকে বলবো "স্যার আপনাকে অনেক ভালোবাসি, আর অনেক মিস করি"।
আরো বলবো, স্যার সেদিন স্কুলে টিফিনের সময় পার হয়ে গিয়েছিল আমি বুঝতে পারিনি। তরুর দোকানে ১টাকার কয়েন দিয়ে সেদিন আমি, তিতাস Asm Titasআর তন্ময় Tanmay Shordar একেবারেই গেমের ভেতরে ঢুকে গেছিলাম। জানেন স্যার, আমি সেদিন Aero Fighter 2 এর লাস্ট বস পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম! কিন্তু গেমসের উন্মাদনায় টিফিনের ঘন্টা কানে পৌঁছাতে পারেনি।
পুরো স্কুলের সামনে গুনে গুনে আটটি বেতের বাড়ি খেয়েছিলাম স্যার। সেই শব্দ এখনো আমার কানে বাজে। বিশ্বাস করেন স্যার, সেদিনের আপনার প্রতিটা বেতের বাড়ি আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা কষ্ট দিলেও পরে আপনার প্রতি সম্মান আর ভালবাসা বাড়িয়েছে বেশী। হ্যাঁ, তখনকার ছেলেমানুষ মন হয়ত আপনার প্রতি রাগে-অভিমানে কিছুটা ভরপুর হয়েছিল কিন্তু স্কুল ছাড়ার পর থেকেই তা যেন ব্যস্তানুপাতিকহারে পরম শিক্ষায়, সন্তুষ্টিতে, কৃতজ্ঞতায় এবং শ্রদ্ধায় পরিণত হয়েছিল। আপনার প্রতি কোন রাগ, কোন ক্ষোভ নেই বরং আপনার প্রতি রয়েছে অনেক দোয়া, ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধা।
আপনাকে না বলা কথা গুলো আর বলা হলো না স্যার। হোয়াংহো নদীর দুঃখ বর্তমান চীন কাটিয়ে উঠতে পারলে আপনাকে তা জানাতে না পারার দুঃখ আমার রয়েই গেলো। ভেবেছিলাম আপনাকে গর্ব করে বলব যে, আমি এখন জাপানে থাকি এবং মজার ব্যাপার হলো, সেই গেমসটাও জাপানের তৈরি ছিল। এখানে Sonic Wings (ソニックウィングス Sonikku~uingusu ) বলে ওই গেমসটাকে। ভেবেছিলাম এসব শুনে আপনি হাসবেন, ঠাট্টা করবেন, আবার গর্বও করবেন। তা আর হলো না স্যার।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, উনি যেন আপনাকে জান্নাতবাসী করেন।
আপনার দেওয়া সুশিক্ষায় সুশিক্ষিত হতে পেরেছি কিনা জানিনা তবে যারা হতে পেরেছেন তাদের ভালো কাজের নেকির ভাগীদার নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আপনাকেও করবেন।
অন্ততঃ
আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই শেখা।

কোন মন্তব্য নেই