জাপানের পথ
আমার খুব প্রিয় জায়গা। এর কোন শেষ নেই। অন্তহীন। সুদীর্ঘ এই পথের উপরেই কেটেছে আমার কর্মজীবনের লম্বা সময়। পথে পথে টো টো করে ঘুরে বেড়িয়েছি সারা বাংলাদেশ। এই পথ চলতে গিয়ে নানান ঘটনা ঘটেছে, এর ভেতরে হাজারো মজার ঘটনা তো আছেই। পথে সাধারণত অপরিচিত মানুষের সাথে মশকরা দিয়ে শুরু করতে ভাল লাগে। কখনও মশকরা ফেরত পেয়েছি আর কখনো পেয়েছি তাদের বোকাসোকা চেহারা। বুঝতে পারেনি। পথ আমাকে জীবনে অনেক কিছু দিয়েছে। মত দিয়েছে হাজারো। যেহেতু যত মত তত পথ৷ পথেই পেয়েছি বাসা, ভালবাসা, আশা। পথ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র। গায়ে মোবাইল নম্বর লেখা বা না লেখা টাকা পয়সা থেকে শুরু করে কলম, ড্রাইভিং লাইসেন্স, সিম কার্ড, চাবি, চাবির রিং, পায়েল, মাথার ক্লিপ, সিগারেটের প্যাকেট, গ্যাস লাইট, টর্চলাইট, হেডফোন, সানগ্লাস, টুপি, জামাকাপড়সহ আরো হাজারো জিনিস। এই লিস্টে এমন ছোটখাটো আরো অনেক কিছুই আছে যা উল্লেখযোগ্য না।
তবে পথে খুইয়েছিও অনেক। মূল্যবান সময় ছাড়া বাকী কিছুর নাম আর নাই বলি। তবে পথে রেখে এসেছি হাজারো স্মৃতি। পথের ওপরে, পাথের ধারে, পথের বাঁকে কত স্মৃতি! ওগুলো ফেলে এসেছি। তাছাড়া হাতঘড়ি, মোবাইল, মানিব্যাগ, ছাতা, সানগ্লাস, টুপি এমনকি স্কুলের শেষ দিনেই প্রিয় সাইকেল হারিয়েছিলাম। এসব জিনিস হারানোর পর একদুইবার জায়গাগুলো ঢুঁ মেরে দেখেও আমার কোন লাভ হয়নি, বরং যে পেয়েছে লাভ তারই হয়েছে। মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছা করে হারিয়ে যেতে, পথের মাঝে হারিয়ে যাব। হারিয়ে যাব পৃথিবীর শেষ সীমানায়। পথের দুই পাশে সারিসারি গাছ। গাছের ছায়া দিয়ে ঢাকা পথ। কখনও আশেপাশে পড়বে ছোট খাটো খাল বা নদী। পাখি উড়ে বেড়াবে-ডাকবে। চারিপাশে সবুজ আর সবুজ৷ ফসলের গন্ধ, পানির শব্দ, ঝুম করে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে। আমাকে আর আমার পকেটের ডিভাইসগুলোকে। নষ্ট করবে আমাদের। এসবের ভেবে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা হয় বার বার। কিন্তু দেখা যায় এসবের ভেতরে গেলে আমি হারাই না, আমার জিনিসপত্র হারায়।
জাপানে এসেও হারানোর গল্প চলমান আছে। তবে মনে হয় এখানে রাস্তায় কিছু পড়ে থাকলে কেউ ভুলেও তুলে দেখেনা। তবে সবাই এই ভুল করলেও আমি ভুল ভুলেও করিনা। তুলে দেখি জিনিসটা কি, কার। আর হ্যাঁ, প্রচুর পরিমাণে ফেরত দেওয়ার রেকর্ডও আছে কিন্তু আমার। হ্যাঁ, তবে রাস্তায় আমাকে দেখে কেউ মন হারালে তা হয়তো ফেরত দিতে পারিনি। আর আমিও এমন মন হারালে ফেরত চাইনি, কখনো পাইনি এবং কখনোও চেয়েও পাইনি। তবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেরত দিয়েছি। কুরিয়ারেও ফেরত দিয়েছি। এমনকি বাসায় বা অফিসে নিজে যেচে গিয়েও ফেরত দিয়েছি। হারানো জিনিস ফিরে পেলে মন এবং হাত দুটোই ভরে ওঠে।
তবে সেদিন জাপান আমার এক হাত খালি করেছে দিয়েছে। আমার ডান হাত। ওইদিন ৪ঠা মার্চে অফিস শেষে কিছু কেনাকাটার জন্য সাইকেল ঠেলে Lowson যাচ্ছিলাম। আরামেই যাচ্ছিলাম হেলেদুলে। হঠাৎ আরামের মাঝে কোন কাজে বাম হাত ঢুকিয়ে দিল কেউ। মোবাইল বেজে উঠল পকেটে। এবার আমি আমার ডান হাতটাকে হাতমোজার আবরণ থেকে মুক্ত করে যুক্ত হলাম মোবাইলে কথা বলাতে। এর ভেতরে কথা বলতে বলতেই দোকান থেকে কেনা-কাটা-কুটি শেষে সাইকেলের কাছে ফিরে এসে দেখি মোজা একখান নেই। একহাত খালি করে দিল জাপান! ডান হাতের মোজা না পেয়ে বাম হাত মাথায়। এদিক ওদিক খুঁজে না পেয়ে Lowson-এ মিত্রকে বললাম ওদের ওখানটা ভাল করে দেখতে। ও পেলোনা। আমি অগত্যা ডানহাতটা পকেটে রেখে বাসায় ফিরলাম। এই মোজাটা দেশ থেকে এনেছি, শুন্য ডিগ্রিতেও হাতের রেখা বদলাবে না। কপাল ভাল রাখবে। ঠান্ডায় মারা যাবেন না। অথচ এখন কি হবে? আরেক জোড়া কি বের করবো তাহলে! এইসব ভাবতে ভাবতে সময় গেলো।
তো পরদিন অফিসে যাবার পথে অন্য একজনের ঠিক ডান হাতেরই একটা হাতমোজা পড়ে থাকতে দেখলাম। এটা কম কাজের। কিন্তু ভাজ খুলে তুলে দেখলাম আপাতত কাজ চালানো যায়। শুধু সাইকেল চালানোর সময়ই তো। তাই উলের মালটা তুলে নিয়ে গেলাম। কয়েকদিন ওটার উপর ভর করেই হেলেদুলে আছি।
গত কালকে অফিস থেকে ফেরার সময় আবারও কেনাকাটা করার জন্য সেই Lowson এর রাস্তায় রওনা দিলাম। ওখানে পৌঁছানোর বেশ কিছুদূর আগে থেকেই ভাবছি যে "ইশ" এতো দরকারি জিনিসটা হারালাম!"। মনে মনে খুঁজতে খুঁজতে আসছি। ইন্না-লিল্লাহি পড়ছি (এটাতে চরম কাজ হয়)। এই লেনের চারিপাশটা আমার চেনা। লোকজন নেই তেমন। সাজানো-গোছানো বাড়িঘরগুলো নিথর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে আর সাঁই সাঁই বেগে গাড়ি যাচ্ছে পাস দিয়ে। আমিও এদিক ওদিক তাকাতেই দেখি ডানপাশের রাস্তার ধারের ফুলের গাছের উপরে আমার ডানহাতের মোজাটা সোজা হয়ে পড়ে আছে। আমি তো অবাক! সাইকেল রেখে নেমে আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম! আইস সালা! ভাবা যায়! কি সাংঘাতিক! আহা! কি আনন্দ! গতকাল ৯ই মার্চ ছিল। অর্থাৎ ৫ দিন পর যেয়েও ফিরে পেলাম। কি বিচিত্র এই দেশ। আমি চারিপাশটা আবার ঘুরেফিরে দেখলাম। মনে হলো বাড়িগুলো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেন আমার জিনিস আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে ওরাও খুশি। খানিক নাচলাম আনন্দে। আমার সাথে যোগ দিল পথের ধারের কয়েকটা চড়ুই, আর নাম না-জানা কয়েকটা ফুল। বাতাস কানে কানে বলে গেলো এবার মানুষেরটাও ফিরিয়ে দাও গিয়ে। আকাশটা অনেক সুন্দর এখন চাঁদটা দেখতে ঈদের চাঁদের মতন।
আমি নিশ্চিত হলাম যে এই রাস্তায় আমার মতন আর কেউ যায়নি। তাহলে হয়ত কপালে খালি হাতই পড়তো, হাতে মোজা পরতে হতো না।
তো আজ সকালে, যেখান থেকে আমি আরেকটা ডান হাতের মোজা পড়ে পেয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে রত্নটা যত্ন করে রেখে আসব ভাবছি।
এই পথ আমাকে শুন্য হাতে কখনোই ফেরায়নি, দুই হাত ভরে দিয়েছে- অন্ততঃ মোজা দিয়ে।
তবে পথে খুইয়েছিও অনেক। মূল্যবান সময় ছাড়া বাকী কিছুর নাম আর নাই বলি। তবে পথে রেখে এসেছি হাজারো স্মৃতি। পথের ওপরে, পাথের ধারে, পথের বাঁকে কত স্মৃতি! ওগুলো ফেলে এসেছি। তাছাড়া হাতঘড়ি, মোবাইল, মানিব্যাগ, ছাতা, সানগ্লাস, টুপি এমনকি স্কুলের শেষ দিনেই প্রিয় সাইকেল হারিয়েছিলাম। এসব জিনিস হারানোর পর একদুইবার জায়গাগুলো ঢুঁ মেরে দেখেও আমার কোন লাভ হয়নি, বরং যে পেয়েছে লাভ তারই হয়েছে। মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছা করে হারিয়ে যেতে, পথের মাঝে হারিয়ে যাব। হারিয়ে যাব পৃথিবীর শেষ সীমানায়। পথের দুই পাশে সারিসারি গাছ। গাছের ছায়া দিয়ে ঢাকা পথ। কখনও আশেপাশে পড়বে ছোট খাটো খাল বা নদী। পাখি উড়ে বেড়াবে-ডাকবে। চারিপাশে সবুজ আর সবুজ৷ ফসলের গন্ধ, পানির শব্দ, ঝুম করে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে। আমাকে আর আমার পকেটের ডিভাইসগুলোকে। নষ্ট করবে আমাদের। এসবের ভেবে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা হয় বার বার। কিন্তু দেখা যায় এসবের ভেতরে গেলে আমি হারাই না, আমার জিনিসপত্র হারায়।
জাপানে এসেও হারানোর গল্প চলমান আছে। তবে মনে হয় এখানে রাস্তায় কিছু পড়ে থাকলে কেউ ভুলেও তুলে দেখেনা। তবে সবাই এই ভুল করলেও আমি ভুল ভুলেও করিনা। তুলে দেখি জিনিসটা কি, কার। আর হ্যাঁ, প্রচুর পরিমাণে ফেরত দেওয়ার রেকর্ডও আছে কিন্তু আমার। হ্যাঁ, তবে রাস্তায় আমাকে দেখে কেউ মন হারালে তা হয়তো ফেরত দিতে পারিনি। আর আমিও এমন মন হারালে ফেরত চাইনি, কখনো পাইনি এবং কখনোও চেয়েও পাইনি। তবে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেরত দিয়েছি। কুরিয়ারেও ফেরত দিয়েছি। এমনকি বাসায় বা অফিসে নিজে যেচে গিয়েও ফেরত দিয়েছি। হারানো জিনিস ফিরে পেলে মন এবং হাত দুটোই ভরে ওঠে।
তবে সেদিন জাপান আমার এক হাত খালি করেছে দিয়েছে। আমার ডান হাত। ওইদিন ৪ঠা মার্চে অফিস শেষে কিছু কেনাকাটার জন্য সাইকেল ঠেলে Lowson যাচ্ছিলাম। আরামেই যাচ্ছিলাম হেলেদুলে। হঠাৎ আরামের মাঝে কোন কাজে বাম হাত ঢুকিয়ে দিল কেউ। মোবাইল বেজে উঠল পকেটে। এবার আমি আমার ডান হাতটাকে হাতমোজার আবরণ থেকে মুক্ত করে যুক্ত হলাম মোবাইলে কথা বলাতে। এর ভেতরে কথা বলতে বলতেই দোকান থেকে কেনা-কাটা-কুটি শেষে সাইকেলের কাছে ফিরে এসে দেখি মোজা একখান নেই। একহাত খালি করে দিল জাপান! ডান হাতের মোজা না পেয়ে বাম হাত মাথায়। এদিক ওদিক খুঁজে না পেয়ে Lowson-এ মিত্রকে বললাম ওদের ওখানটা ভাল করে দেখতে। ও পেলোনা। আমি অগত্যা ডানহাতটা পকেটে রেখে বাসায় ফিরলাম। এই মোজাটা দেশ থেকে এনেছি, শুন্য ডিগ্রিতেও হাতের রেখা বদলাবে না। কপাল ভাল রাখবে। ঠান্ডায় মারা যাবেন না। অথচ এখন কি হবে? আরেক জোড়া কি বের করবো তাহলে! এইসব ভাবতে ভাবতে সময় গেলো।
তো পরদিন অফিসে যাবার পথে অন্য একজনের ঠিক ডান হাতেরই একটা হাতমোজা পড়ে থাকতে দেখলাম। এটা কম কাজের। কিন্তু ভাজ খুলে তুলে দেখলাম আপাতত কাজ চালানো যায়। শুধু সাইকেল চালানোর সময়ই তো। তাই উলের মালটা তুলে নিয়ে গেলাম। কয়েকদিন ওটার উপর ভর করেই হেলেদুলে আছি।
গত কালকে অফিস থেকে ফেরার সময় আবারও কেনাকাটা করার জন্য সেই Lowson এর রাস্তায় রওনা দিলাম। ওখানে পৌঁছানোর বেশ কিছুদূর আগে থেকেই ভাবছি যে "ইশ" এতো দরকারি জিনিসটা হারালাম!"। মনে মনে খুঁজতে খুঁজতে আসছি। ইন্না-লিল্লাহি পড়ছি (এটাতে চরম কাজ হয়)। এই লেনের চারিপাশটা আমার চেনা। লোকজন নেই তেমন। সাজানো-গোছানো বাড়িঘরগুলো নিথর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে আর সাঁই সাঁই বেগে গাড়ি যাচ্ছে পাস দিয়ে। আমিও এদিক ওদিক তাকাতেই দেখি ডানপাশের রাস্তার ধারের ফুলের গাছের উপরে আমার ডানহাতের মোজাটা সোজা হয়ে পড়ে আছে। আমি তো অবাক! সাইকেল রেখে নেমে আনন্দে চিৎকার করে উঠলাম! আইস সালা! ভাবা যায়! কি সাংঘাতিক! আহা! কি আনন্দ! গতকাল ৯ই মার্চ ছিল। অর্থাৎ ৫ দিন পর যেয়েও ফিরে পেলাম। কি বিচিত্র এই দেশ। আমি চারিপাশটা আবার ঘুরেফিরে দেখলাম। মনে হলো বাড়িগুলো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেন আমার জিনিস আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে ওরাও খুশি। খানিক নাচলাম আনন্দে। আমার সাথে যোগ দিল পথের ধারের কয়েকটা চড়ুই, আর নাম না-জানা কয়েকটা ফুল। বাতাস কানে কানে বলে গেলো এবার মানুষেরটাও ফিরিয়ে দাও গিয়ে। আকাশটা অনেক সুন্দর এখন চাঁদটা দেখতে ঈদের চাঁদের মতন।
আমি নিশ্চিত হলাম যে এই রাস্তায় আমার মতন আর কেউ যায়নি। তাহলে হয়ত কপালে খালি হাতই পড়তো, হাতে মোজা পরতে হতো না।
তো আজ সকালে, যেখান থেকে আমি আরেকটা ডান হাতের মোজা পড়ে পেয়েছিলাম, সেখানে গিয়ে রত্নটা যত্ন করে রেখে আসব ভাবছি।
এই পথ আমাকে শুন্য হাতে কখনোই ফেরায়নি, দুই হাত ভরে দিয়েছে- অন্ততঃ মোজা দিয়ে।

কোন মন্তব্য নেই