বিনয়ের জাপান
জাপানের কিছু বিষয়ে আমি খুবই বিরক্ত। বাংলাদেশ থেকে এখানে আসার পর অনেক কিছুই অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটছে আমার সাথে। যার কারণে আসলেই মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে। বিরক্ত হবার কারণই হলো কেউ বিরক্ত করে না। দেশে থাকতে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত বিরক্ত হবার মতন কয়েক কোটি কারণ ছিল। আর এখানে বিরক্ত না হওয়াটাই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন জাপানের অন্যতম বড় শহর নাগোয়াতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ট্রেনে ওঠার সময় এক মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, "এই ট্রেন কি চির্যু স্টেশনে যাবে?" উনি সম্মতি জানালেন।
তো ট্রেনে চেপে বসতেই ঘুম চলে এলো। স্টেশনে আসার কিছুক্ষণ আগেই দৈবক্রমে ঘুম ভেঙে গেলো এবং চোখ মেলে দেখি একটা মেয়ে আমাকে ইশারা করছে। আমি ভাবলাম এখনো বোধহয় ঘুমের ভেতরেই আছি, তা নাহলে এই সুরতে কেউ ইশারা করবে কেন!
তখনই হঠাৎ মনে পড়ল.. আরে এ তো সেই মেয়েটা, যাকে ট্রেনে ওঠার আগে জিজ্ঞাসা করেছিলাম!
খুবই ভাল লাগলো ব্যাপারটা। উনি অপর পাশের দূরের সিটে বসেই ইশারায় বললেন যে আপনার গন্তব্যে চলে এসেছেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম জাপানিজদের এই যত্নশীলতায়। কেন উনি বিরক্ত হলেন না।
অথচ আমি বিরক্ত হয়ে সেদিন আরেকটু হলে তো আমার বসকে মেরেই বসতাম।
আমাদের হলরুমটার ভেতরে ৬টা মেশিন বসানো আছে। আর মাঝখানের মেশিন দুইটার কার্যক্রম প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ গজ পর্যন্ত। একপাশে টিন, নিকেল, সোনা, কপার (Sn, Ni, Au, Cu) মিশ্রিত ১০৫ মিলিমিটারের পাত ঢুকছে আর আরেকপ্রান্ত দিয়ে প্লাস্টিকের মোল্ডের সাথে মোড়ানো সার্কিটের মতন একেকটা ডিভাইস বের হচ্ছে। গাড়ির হাতলের পার্টস। তো এ যন্ত্রের মাঝামাঝি জায়গাটা খানিকটা সরু। কারণ এখানে কিছু রোবটিক হাত রয়েছে যা সয়ংক্রিয়ভাবে এদিক সেদিকে নড়াচড়া করে। অনেকটা টার্মিনেটর সিনেমার মতন। জীবন্ত মেশিন টাইপের৷
আমার বস আর আমি সেই সরু জায়গাটা পার হবার সময় সাঁকো পারাপারের মতন অবস্থা হয়ে গেলো।
এখন আমি বলি "বস আপনি আগে আসেন" বস বলে না না " আপনি আগে আসেন"
ধরেন এইভাবে মিনিট দু'য়েক ঠেলাঠেলি করতে করতে মেজাজ যখন চড়া, তখনই উনি পার হয়ে এসে মাথা নিচু করে ধন্যবাদ জানালেন। ব্যাটাকে আরেকটু হলেই মেরে বসতাম! এতো বিনয়ী কেন আপনারা!
গতরাতে তেল কিনতে যাব, তেল মানে কেরোসিন। একটা রুম হীটার চালাব। তো ঠ্যালায়, ঘোরতে রাত প্রায় নয়টা। সব বন্ধ। একটা বইয়ের দোকান পেলাম খোলা। চলে গেলাম। "আফা এখানে তেল পাওয়া যায় কোথায়?"
মনে হলো স্বয়ং ভগবান উনার সামনে। উনি কোথায় বসাবেন, কি আপ্যায়ন করবেন তার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রথমেই উনি উনার কাউন্টার বন্ধ করে দিলেন। এরপর আমার কথা শুনে বললেন "আসলে এই সময়ে তো দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আমরা দুঃখিত। তবে আমি চেষ্টা করছি"
এই বলে উনি মিনিট দশেক খরচ করে আমাকে গ্যাস স্টেশনের খবর দিলেন। এর মধ্যে ৩টা ফোন করলেন এবং জানার চেষ্টা করলেন যে দোকান খোলা আছে কিনা, আরো কতক্ষণ থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ নেই মুখে, বিনয়ী চেহারা নিয়ে সাহায্য করে গেলেন এবং খেয়াল রাখলেন যেন আমার অসুবিধা না হয়।

এরকম গল্প প্রতিদিন ঘটছে, লেখার সময় সুযোগ হচ্ছে না। কাজ পাগল এই জাতির উন্নতির পেছনে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম আর বিনয়ী ব্যাপারটা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী উপলব্ধি করতে পেরেছি।
এখনও আমার মনে আছে যে প্রতিষ্ঠানের মালিক আমার দুই ব্যাগ (২৩+২৩= ১ মণ) টেনে তুলে দিয়েছিল দুই তলাতে। জিজ্ঞাসা করলাম আমাকে আগে ডাকেননি কেন? উনি বললেন এখন আপনার ঘুমানোর সময়, বিরক্ত হন যদি!
সেদিন জাপানের অন্যতম বড় শহর নাগোয়াতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ট্রেনে ওঠার সময় এক মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, "এই ট্রেন কি চির্যু স্টেশনে যাবে?" উনি সম্মতি জানালেন।
তো ট্রেনে চেপে বসতেই ঘুম চলে এলো। স্টেশনে আসার কিছুক্ষণ আগেই দৈবক্রমে ঘুম ভেঙে গেলো এবং চোখ মেলে দেখি একটা মেয়ে আমাকে ইশারা করছে। আমি ভাবলাম এখনো বোধহয় ঘুমের ভেতরেই আছি, তা নাহলে এই সুরতে কেউ ইশারা করবে কেন!
তখনই হঠাৎ মনে পড়ল.. আরে এ তো সেই মেয়েটা, যাকে ট্রেনে ওঠার আগে জিজ্ঞাসা করেছিলাম!
খুবই ভাল লাগলো ব্যাপারটা। উনি অপর পাশের দূরের সিটে বসেই ইশারায় বললেন যে আপনার গন্তব্যে চলে এসেছেন। মুগ্ধ হয়ে গেলাম জাপানিজদের এই যত্নশীলতায়। কেন উনি বিরক্ত হলেন না।
অথচ আমি বিরক্ত হয়ে সেদিন আরেকটু হলে তো আমার বসকে মেরেই বসতাম।
আমাদের হলরুমটার ভেতরে ৬টা মেশিন বসানো আছে। আর মাঝখানের মেশিন দুইটার কার্যক্রম প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ গজ পর্যন্ত। একপাশে টিন, নিকেল, সোনা, কপার (Sn, Ni, Au, Cu) মিশ্রিত ১০৫ মিলিমিটারের পাত ঢুকছে আর আরেকপ্রান্ত দিয়ে প্লাস্টিকের মোল্ডের সাথে মোড়ানো সার্কিটের মতন একেকটা ডিভাইস বের হচ্ছে। গাড়ির হাতলের পার্টস। তো এ যন্ত্রের মাঝামাঝি জায়গাটা খানিকটা সরু। কারণ এখানে কিছু রোবটিক হাত রয়েছে যা সয়ংক্রিয়ভাবে এদিক সেদিকে নড়াচড়া করে। অনেকটা টার্মিনেটর সিনেমার মতন। জীবন্ত মেশিন টাইপের৷
আমার বস আর আমি সেই সরু জায়গাটা পার হবার সময় সাঁকো পারাপারের মতন অবস্থা হয়ে গেলো।
এখন আমি বলি "বস আপনি আগে আসেন" বস বলে না না " আপনি আগে আসেন"
ধরেন এইভাবে মিনিট দু'য়েক ঠেলাঠেলি করতে করতে মেজাজ যখন চড়া, তখনই উনি পার হয়ে এসে মাথা নিচু করে ধন্যবাদ জানালেন। ব্যাটাকে আরেকটু হলেই মেরে বসতাম! এতো বিনয়ী কেন আপনারা!
গতরাতে তেল কিনতে যাব, তেল মানে কেরোসিন। একটা রুম হীটার চালাব। তো ঠ্যালায়, ঘোরতে রাত প্রায় নয়টা। সব বন্ধ। একটা বইয়ের দোকান পেলাম খোলা। চলে গেলাম। "আফা এখানে তেল পাওয়া যায় কোথায়?"
মনে হলো স্বয়ং ভগবান উনার সামনে। উনি কোথায় বসাবেন, কি আপ্যায়ন করবেন তার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রথমেই উনি উনার কাউন্টার বন্ধ করে দিলেন। এরপর আমার কথা শুনে বললেন "আসলে এই সময়ে তো দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আমরা দুঃখিত। তবে আমি চেষ্টা করছি"
এই বলে উনি মিনিট দশেক খরচ করে আমাকে গ্যাস স্টেশনের খবর দিলেন। এর মধ্যে ৩টা ফোন করলেন এবং জানার চেষ্টা করলেন যে দোকান খোলা আছে কিনা, আরো কতক্ষণ থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ নেই মুখে, বিনয়ী চেহারা নিয়ে সাহায্য করে গেলেন এবং খেয়াল রাখলেন যেন আমার অসুবিধা না হয়।

এরকম গল্প প্রতিদিন ঘটছে, লেখার সময় সুযোগ হচ্ছে না। কাজ পাগল এই জাতির উন্নতির পেছনে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম আর বিনয়ী ব্যাপারটা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী উপলব্ধি করতে পেরেছি।
এখনও আমার মনে আছে যে প্রতিষ্ঠানের মালিক আমার দুই ব্যাগ (২৩+২৩= ১ মণ) টেনে তুলে দিয়েছিল দুই তলাতে। জিজ্ঞাসা করলাম আমাকে আগে ডাকেননি কেন? উনি বললেন এখন আপনার ঘুমানোর সময়, বিরক্ত হন যদি!
কোন মন্তব্য নেই