Header Ads

জাপানে ২১শে ফেব্রুয়ারি

ভোরভারে উঠে সকাল সকাল অফিস যেতে হবে, তাই রাতের বেলায় পতাকা বের করে রাখলাম। প্রভাত ফেরীতে না যেতে পারলে হবে কি দিনের বেলা পতাকা বুকে নিয়ে মনের সুখে সাইকেলে উড়ে বেড়াবো না? যাই হোক পতাকাটা সাথে নিয়ে অফিসে গেলাম। দিনের কাজ যথারীতি সকাল ৮ টা তে আমাদের টিমের মিটিং দিয়ে শুরু হয়। মিটিংয়ে যেটা হয়, ক্রমান্বয়ে সবাই গতকাল কি কাজ করেছে তার বর্ণনা দেয় আর আজ কি করবে সেটা বলে। সবার শেষে আমার পালা আসে। আমি যা বলি তা হলো, প্রতিদিন দুইটা একটা করে নতুন জাপানিজ শব্দ ও তার মানে। তো সেদিন যখন আমার পালা এলো, তখন আমি বললাম "আজকে আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে চাই। সবার কাছ থেকে দুই মিনিটের জন্য সময় চেয়ে নিচ্ছি" আমার বস এবং তার বস ছাড়া বাকি আটজনের কেউই ইংরেজি বোঝেনা। বস সবাইকে একটু অপেক্ষা করতে বললেন। আমি আমার বস কে বললাম আজকে আমার জন্য দিনটা অনেক গুরুত্ব বহন করছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছিল আজকের এই বাংলা ভাষার জন্য। তাই প্রতি বছর আমরা এই দিনটাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। পৃথিবীর বুকে আমরাই একমাত্র দেশ যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। এই কথা শুনে বস এবং বাকি সবাই খুবই অবাক হলো। "আজকে আমি আমার ভাষায় দুইটা লাইন বলতে চাই" আমি বললাম। উনারা সবাই আমার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকলো। "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি... আমি কি ভুলিতে পারি" সুর করে গাইলাম। বস সবাইকে এটার মানে বুঝিয়ে দিলে সবাই অবাক হলো এবং দুঃখ প্রকাশ করল।




ঘটনাটা আরো কিছুদূর না টেনে এখানেই শেষ হলেও পারতো। কিন্তু না! দুপুরের বিরতিতে যাবার আগে এক ফাঁকে বস আমাকে ডাক দিলেন। বললেন, "নাসিম আমি আজকের এই দিনটার ব্যাপারে ইন্টারনেটে পড়ে দেখেছি। এই দিনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের সবার জন্য। আমরাও এই দিনটাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই এবং এই দিনটার ব্যাপারে বাকি সবার জানা উচিত"। তিনি এই একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কিত অনেক তথ্য একটা পৃষ্ঠায় জড়ো করেছেন। আমাকে দেখালেন। এমনকি টোকিওর ইকিবুকুরু-তে অবস্থিত শহীদ মিনারের ছবিও যোগ করতে ভোলেননি তিনি। এরপরে সেই কাগজটা সবার হাতে দিয়ে পড়তে বললেন। আমি তো পারলে এটা দেখে আবেগে কেঁদেই ফেলি। সবাই আমাকে অভ্যর্থনা জানালো এবং পাশাপাশি শোক প্রকাশ করল। অন্য আরেকটি দেশের প্রতি, তার ভাষার প্রতি জাপানিদের এতো ভালোবাসা দেখে বিমোহিত হয়ে গেলাম। অথচ আমরা আমাদের ভাষাকে ততটা গুরুত্ব দিই না যতটা আমাদের দেওয়ার কথা ছিল। অনেকেই বাংলায় লেখার অজুহাত হিসেবে স্থায়ীভাবে কীবোর্ড এবং বর্তমান প্রযুক্তিকে দায়ী করেন। অনেকের টাইপ করতে হাত ব্যথা হয়ে যাওয়ার কথাও বলেন। আমার মনে হয় কি, সকল সমস্যারই কিছু না কিছু সমাধান যেমন থাকে, তেমনি এটারও আছে। চাইলে মোবাইলের জন্য খুব সহজেই Ridmik বাংলা কিবোর্ড অথবা Mayabi বাংলা কীবোর্ড অথবা গুগলের Gboard নামানো যেতে পারে। প্রথম দুইটা তে খুবই সুন্দর ভাবে ফোনেটিক বাংলা লেখা যায়। আর Gboard এর মাধ্যমে তো আপনি সরাসরি ভয়েস টু টেক্সট করতে পারবেন(মুখে বলবেন আর লেখা হয়ে যাবে)। মজার ব্যাপার হলো, লেখাটি যখন আমি লিখছি তখন আমি বাথটাবে পানির ভেতরে শুয়ে শুয়ে এই কথাগুলি বলছি আর আমার Google Keep-নোটবুকে এই লেখাগুলো টাইপিং মেশিনের মতন লেখা হচ্ছে। পরে লেখাটাকে 'ভারী সুন্দর' করার জন্য শুধু দাড়ি কমা আলাদাভাবে বসিয়ে দিয়েছি। আমি বাংলা শব্দগুলো বাংলায় লিখতে চাই আর যদি কুলোয় তবে ভিন্ন ভাষার শব্দগুলো ভিন্ন ভাষায় । আমি জানি যদিও এটা সব সময় সম্ভব হয় না। তার পরেও আসুন না, আমরা ভাই ভাই সবাই মিলে চেষ্টা করি বাংলায় বাংলা লিখতে। পরের দিন বস আমার সামনে হাজির হলেন একটা সাদা কাগজে চারটা ছক করে। একটাতে বাংলায় বাংলা ফন্ট ব্যবহার করে লিখতে হবে, সেটার মানে ডানপাশে ইংরেজিতে, সেই বাংলা শব্দের উচ্চারণ ইংরেজিতে ফোনেটিক এবং সবার শেষে ডান পাশে জাপানিজ। মানে বসকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটা বাংলা শব্দ শেখানো হয়েছে। বস আমার, প্রতি সপ্তাহের নিয়ম করে দুইটা একটা করে শিখতে চান। আমি অফিস থেকে ফেরার সময় আমাকে "শুভরাত্রি" বলে বিদায় জানায়। কোন কিছুতে খুশি হলে "ধন্যবাদ" বলে। কোথায় আমি জাপানিজ শিখবো কি না, আমার ভাষার গৌরবের সৌরভে জাপানি মানুষটা আমাকে গুরু বানিয়ে এখন বাংলা শেখা শুরু করে দিয়েছে। আমি আসলেও গর্বিত বাংলায় জন্মগ্রহণ করে, বাংলায় কথা বলতে পেরে। যারা বাংলা কিবোর্ডটি ডাউনলোড করতে পারেননি বা ইন্সটল করতে পারছেন না অথবা ব্যবহার করতে পারছেন না আমাকে জানাবেন আমি দেখিয়ে দিব। ধন্যবাদ। (এইখানে অনেক ইংরেজি শব্দ বাংলায় লিখেছি, শব্দগুলো বহুলপ্রচলিত বলে) 

আইফোনের জন্য App Store Link: Gboard – the Google Keyboard by Google LLC https://itunes.apple.com/jp/app/gboard-the-google-keyboard/id1091700242?l=en&mt=8

 অ্যান্ড্রয়েডের জন্য Google Play Store Link: Gboard https://play.google.com/store/apps/details?id=com.google.android.inputmethod.latin

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.