Header Ads

খালি পায়ের স্মৃতি

খালি পায়ের স্মৃতিঃ

আমার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে না পেরে আম্মু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমি একটু অন্যভাবে ভাবতেই পছন্দ করি মা, তোমার মতন করেও না, আবার অন্য কারোর মতন করেও না। তোমাকে কতবার করে বলবো যে আমার শেইভ করতে ইচ্ছা হয়না। শেইভ করলে আমার আয়নার সামনে যেতে ইচ্ছা করে না। তারপরেও তুমি জোর করে রতনের সেলুনে পাঠাও। আমিও তাই সেদিন রতনের সেলুনের পথকে অন্যভাবে সাজিয়ে নিয়েছিলাম।
তুমি বলার পর সেদিন বাড়ি থেকে বের হবার কিছুদূর পর থেকে শুরু হল পাগলামী। জানো মা, গ্রামের মাটির রাস্তাটা অল্পদুর গিয়েই শেষ হয়ে গেলো, শুরু হল আধুনিক শুরকি-পাথরের পাকা রাস্তা। জ্যৈষ্ঠের কড়া দুপুরে কোথায় আমি একটু রাস্তায় ধুলো ওড়াতে ওড়াতে যাব, তা আর হলো না। তারপরেও সংকোচ আর সাময়িক বেদনা ভুলে পা দুটো খালি করে স্যান্ডেল জোড়া বগলের নিচে রেখে হাঁটা জুড়ে দিলাম বাজারের পথে। উদ্দেশ্য ছেলেবেলাকে ফিরিয়ে আনা। মনে আছে মা, পাভেল, সোহাগ আর হুমার কথা? হেনা ফুফু আমাকে বারবার বলতেন যে পরীক্ষার হলে হুমায়নকে পাশে বসানোর জন্য, ছেলেটা সারাদিন ধরে পড়ে পড়েও মাথায় কিছু রাখতে পারে না। আমিও সেটাই করতাম বছরের পর বছর ধরে। মনে আছে অকালে হারানো ভাই সোহাগের কথা। শশার গল্প আর খালে মাছ ধরার ছাড়া তেমন কিছু আর ওর ব্যাপারে মনে পড়েনা। দলছুট ভাইটা আমাদের আগেই পরপারে। আর পাভেল? মাথা থেকে কমপক্ষে চার-পাঁচ হাত পর্যন্ত ধুলো না উড়লে ওর আর আমার স্কুলে যাওয়া জমতো না। হ্যাঁ মা, আমি এখন সেই একই রাস্তায়, সেই ছেলেবেলা ফিরিয়ে আনার জন্য ধুলো উড়ানোর চেষ্টা করে চলেছি, পারছি না। কারণ, পাথরে গাঁথা এই রাস্তার উপর দিয়ে যে আমরা চলে বেড়াই, তাদের অনুভূতিও যেন পাথরের মতন হয়ে গেছে, ভোঁতা হয়ে গেছে। এখন আর আগেকার মতন রাস্তায় না আছে এক হাঁটু কাদা, আর না আছে কারো কাদার মতন নরম মন। তবে মানসিকতাটা কাদার পিচ্ছিলতার মতন হয়েছে অনেকেরই, আরেকজনের উপর দোষ চাপানোর মতন। সেই উঁচুনিচু রাস্তাটায় পা টিপেটিপে স্কুলে যাওয়া, কখনো পা পিছলে পড়ে যাওয়া, কখনো কারো গায়ে কাদাপানি ছিটিয়ে দেওয়া, এমন কত স্মৃতি এই রাস্তাটা জুড়ে। আহ, সব মনে পড়ছে। আসল রাস্তার চেয়ে অন্যের বাড়ির উপরের রাস্তাই বেশী সুবিধা ছিল, অর্ধেকের বেশী রাস্তা তো মানুষের বাড়ির উপর দিয়েই চলাচল করতো তখন।
আর এখন, এবেলা এইসব পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে আর পাছে লোকে কিছু বলে, এই সংশয়ই কাটিয়ে উঠতে উঠতেই অর্ধেক রাস্তা শেষ। অবশ্য লোকে যে কিছু বলেনি তা নয়। ঐ ভ্যানওয়ালা চাচা বাজারে ওঠার মুখে আমার অবস্থা দেখে জিজ্ঞেসই করে বসলো “কি গো পাগলের জামাই? এই রোদের ভেতর খালি পায়ে ধুলো উড়াতে উড়াতে যাচ্ছো, পাগলের ভান করছো নাকি?”
আমি সহাস্যে উত্তর করেছি, “না গো বাবু, এখনও পাগল হইনি”
এরপর বাজারের ভেতরে একজন জুতো-পালিশ মিস্ত্রী আমার বগলে স্যান্ডেল জোড়া দেখে বলেছে “স্যান্ডেল সারবেন নাকি কবি ভাই?”
আবারও আমি সহাস্যে উত্তর করেছি, “না রে ভাই, স্যান্ডেল ছেঁড়েনি”
আর রাস্তায় চলতি পথের মানুষেরা অবাক হয়ে দেখেছে আমাকে। এতো বড় একটা দামড়া ছেলে কিভাবে বাচ্চামি করে চলেছে।
আচ্ছা মা, আমি তো আহা মরি কিছু করিনি। আমি শুধু স্যান্ডেল বগলে করে সারা রাস্তা ধুলো উড়াতে উড়াতে গেছি, রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ের পাতাগুলো ছিঁড়েছি, ওগুলোর গন্ধ নিয়েছি, খোলা আকাশের দিকে চেয়ে থেকেছি আর প্রতি মুহুর্তেই ফিরে পেতে চেয়েছি সেই দুরন্ত শৈশবে । যখন আমার মুখে গোঁফদাড়ি ছিলনা, কোন কথা বলার সময় দাড়ি-কমা চিন্তা করতে হতো না। এসবের আগামাথা তুমি বুঝবে না মা, তোমার কাছে রতনের সেলুনই ভালো। উদ্ভট রকমের চুলদাড়ির জন্য কতদিন যে আব্বু বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেছে রতনের দোকানে, তার হিসেব তুমি ছাড়া আর কে-ই বা জানে।



কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.