দাদার চেয়ার
দাদার চেয়ার
ভোরের খাবার শেষে একটা মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে দেখতে সকাল হয়ে গেলো। আজ সকাল থেকেই মেঘেদের মন ভালো নেই। গোমড়া মুখ। তেতো মুখ। কেমন যেন মুখের একপাশটা কালো কালো হয়ে আছে। আমার ঘুম ভাংলো বেলা ৯টার পরে। মনে হচ্ছিল স্বপ্নটা যদি আরো কিছু সময় নিয়ে দেখতে পারতাম, তাহলে হয়তো ওটাকে বাস্তবের সাথে জোড়া দিতে পারতাম।
আব্বুর কাছে থেকে তার হোন্ডাটা ভাড়া করলাম ঘন্টা দুয়েকের জন্য। সহকর্মী মোস্তাফিজের আগমনের খবর পেয়ে গেলাম আমলায়, অনেকদিন পর। উনার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে শেষে স্কুলটার ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। বড় বড় স্কুলের বিল্ডিংগুলো আর আগের মতন নেই। শরীরে বয়সের ছাপ পড়েছে, জায়গায় জায়গাতে রঙ চটে গেছে আর নিত্যদিনের ময়লা তো আছেই। আমাদের স্কুল বিল্ডিঙের সামনে বেশ কিছু নারিকেল গাছ আছে, যেগুলো আজ থেকে ৯-১০ বছর আগে অনেক ছোট ছিল, আমার মতই। হঠাৎ করেই ওদের খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হল আমার। একটা গাছের নিচে এসে মনে মনে জিজ্ঞাসা করলাম, "খুব বড় হয়ে গেছিস রে, তাইনা?"
বেশ কিছু সময় গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, তারপর উত্তর না পেয়ে ফিরে আসছিলাম। শেষ মুহুর্তে পেছনে তাকালে দেখলাম গাছের গায়ে একটা আংশিক মুখবয়ব, আবেগভরে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কতদিন দেখা হয়নি আমাদের! কথা হয়নি কতদিন! প্রেয়সীর চোখের ভাষা পড়তে পারার পরীক্ষায় ফেইল করলেও ওই চোখের ভাষা ঠিকই পড়ে নিতে পারলাম। এই আকাশকে দেখা হয়নি কতদিন!
এরপর থেকে সারাদিনে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম দুই চাকার উপর। ঘুরলাম সবুজে ভরা পৃথিবীর কয়েক কিলোমিটার, আর আকাশের দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। একদিকে পরিষ্কার ঝকঝকে রোদেলা আকাশ, আর আরেকদিকে মন খারাপ করে থাকা অপরিষ্কার আকাশের বারি বর্ষণের প্রস্তুতি। বৃষ্টির পরে যে একটা অনাবদ্ধ শীতল বাতাসের প্রবাহ হয়, তেমন একটা বায়ুবেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরতে ছিলাম। এমনিতেই সবসময় চারপাশে বাতাস তো থাকেই, কিন্তু সেটাকে অনুভব করা হয় না, ছুঁয়ে দেখা হয় না। মনে মনে যখন চিন্তা করি যা বাতাসকে উপভোগ করছি তখন পুরো শরীরের ভেতরে একটা শিরশিরে ভাব তৈরি হয়। সেইরকম একটা ভাব আর বৃষ্টিতে ভেজার একটা প্রবল ইচ্ছা নিয়ে যখন বাড়ীর আঙিনায় পৌঁছুলাম, দাদাকে দেখলাম তখন বাড়ির বাইরে চেয়ারে বসে আছে। এতো সুন্দর করে বসে আছে! দেখে মনে হলো, ইশ যদি এইভাবে চেয়ারের উপর বসে আরামসে ভিজতে পারতাম!
সারাদিনের আরো অনেক কাজের ক্লান্তি শেষে ঘরে ঢুকতেই গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। বিকেল পাঁচটার দিকে আব্বুর ডাকে ঘুমের বারোটা বাজল। আব্বুর উপর রাগ হলো, মনে মনে গরগর করতে লাগলাম। খেয়াল করলাম কোত্থেকে যেন আসলেও একটা গরগর শব্দ হচ্ছে! আশে পাশে আমার গৃহপালিত কুকুর টমেন-কে খুঁজতে লাগলাম। তারপর শব্দটা প্রকট হলে বুঝলাম শুরু হয়ে গেছে মেঘের খেলা। অবশেষে মনখারাপ করা মেঘগুলো সন্ধ্যার কিছু আগে তাদের সকল ক্ষোভ আর দুঃখমিশ্রিত কান্না ঝরাতে লাগল। উঠোনের চারপাশের টিনের চালের উপর বৃষ্টির শব্দ একটা সময় ভয়ানক হয়ে ওঠে। মনে হয় সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেবে এখনই। আমি একরকম জোর করে বিছানা ছেড়ে উঠলাম, তারপর গা ছেড়ে দিলাম ঝমঝমে বৃষ্টির জলে। সারাদিনের অভুক্ত শরীরের উপর বৃষ্টির তেজী বর্ষণ, খুব বেশীক্ষন দাঁড়িয়ে টিকতে পারলাম না। মনে হল এই খোলা আকাশের নিচে যদি আরো কিছুক্ষন বসে থাকতে পারতাম! বসার কথা মনে হতেই হঠাৎ একটা মুচকি হাসি চলে এলো, দাদার চেয়ারটার কথা মনে পড়ে গেলো।

কোন মন্তব্য নেই